Benami Diary: গল্প
Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

Thursday, June 25, 2020

তিন্নি ও তার সাধের গণেশ

June 25, 2020 1
তিন্নি ও তার সাধের গণেশ











ম্যাক্সমিলান
চারিদিকে আতঙ্কের পরিবেশ, মানুষের সংসর্গে ছড়ায় মূলত এরকম একটা ভাইরাস ঘটিত মহামারীর আবির্ভাব । সরকারি নির্দেশ এলো বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ, সকলেই যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন । রতন ও তার চার সঙ্গী কর্মসূত্রে গিয়েছিল মহারাষ্ট্রে। ঠিকাদার বললো ওখানেই থেকে যেতে; কয়দিন পর সব মিটলে ফিরতে। তাই ওরা সেখানেই রয়ে গেলো।
তিনমাস কেটে গেলো রোগ ছড়িয়েই যাচ্ছে, প্রকোপ বাড়ছে বই কমছেনা। হাতের টাকাও ফুরিয়ে আসছে ওদের । বেশ চাপে পড়লো সকলেই । বিদেশ বিভূঁইয়ে চেনা শোনা নেই তার উপর আবার পরিস্থিতি খারাপ। অগত্যা বাড়ি ফেরার ই সিদ্ধান্ত নিল সকলে। গাড়ি ট্রেন সবই বন্ধ তাই ভগবানের নাম করে পায়ে হেঁটেই শুরু করলো যাত্রা। 


রতনের বাড়িতে আছে ওর বিধবা মা, স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলে। রতন যথেষ্ঠ শিক্ষিত, দর্শনে গ্র্যাজুয়েট । বাবার জমি জমা ভালোই ছিল, কিনতু চাষ করতে পারতেন না । রতনের তিন দিদি ও রয়েছে, জমি জমা বিক্রি করেই তাদের বিয়ে দিয়েছেন রতনের বাবা। বছর সাতেক আগে অসীমার সাথে রতনের বিয়ে হয়। অসিমার বয়স তখন সবে ১৭, অপটু হাতে রান্না বান্না, ঘর গোছানো করতে হতো সবই । ছোট মেয়েটাকে এতো খাটতে দেখে মাঝে মাঝে মায়া হতো, তাই ভুল করলেও কোনদিন বকাবকি করত না । রতনের মেয়ের নাম তিন্নি। ভাদ্র মাসের তিন তারিখে তিন্নির জন্ম হয়েছিল বলে ওর নাম রাখে তিন্নি। এখনো তার মনে আছে প্রথম যখন তিন্নি কে কোলে নিয়েছিল ; সেই ছোট্ট ছোট্ট হাত ; একদম জেলির মতো । কেঁদে উঠেছিল জোর করে ; ঘাবরে গিয়েছিল রতন তখন ।ওর মায়ের কোলে দিয়ে পালিয়ে আসে সেবার। তারপর কেটে গেছে বহুদিন ; তিন্নির সবে মাত্র ছয় বছর বয়স কিনতু তার কথা ষাট বছরের বুড়োদের মত। ওকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করতো বুড়ি তোর বাবার নাম কি? 
ও উত্তর দিতো- বাবার নাম বাবা ই । 
আর মায়ের নাম জিজ্ঞেস করলেই বলতো - 
জানি না ওটা আমার শত্তুর।
বাবা বাবা করেই পাগল।
গেলবছর দুর্গাপুজোয় রতন যখন শেষবার বাড়ি গিয়েছিল তখন তিন্নি কে একটা খেলনা ফোন কিনে দেয় আর তারপর থেকে অসীমা কোনোকিছুতে বকাবকি করলে ও সেই ফোন টা নিয়ে শুরু করে দেয় - হ্যালো বাবা ওই সত্তুর টা আমায় বকেছে.... পুরোটাই অসীমার মুখেই শুনেছে রতন আর খুব হেসেওছে। ফোনে প্রতিদিন রাত্রে কথা হয় অবশ্য ওদের সাথে । সেবার পুজো সেরে যখন যাওয়ার সময় হলো অসীমা তখন সাতমাসের অন্ত্বসত্ত্বা , একটুও ইচ্ছে ছিলনা রতনের কাজে যাওয়ার । অসীমা ই জোর ধরলো যেতে; বললো মা তো রয়েছে আর দরকার পড়লে দাদাকে (অসীমার দাদা) ডাকবো , আমি সামলে নিতে পারবো নাও। অগত্যা সংসারে টাকা পয়সার গুরত্ব ও তো আর কম না,  কাজে না গেলে সংসার ই বা চলবে কীকরে তাই বেরিয়ে পড়লো। তিনমাস হলো রতনের একটা ছেলে হয়েছে কিনতু সব বন্ধ থাকায় ফিরতে পারেনি , তাই দেখেনি এখনো ছেলেকে । তবে ছবি দেখেছে আর নাম রেখেছে তাপস। ছেলের জন্য একটা রুপোর তাবিজ কিনে রেখেছে । আর তিন্নি বায়না ধরেছিল একটা লাল রঙের গণেশ ঠাকুর নেবে, লাল পায়নি সাদা কিনেছে একটা । দোকান পাট এমনিতেই সব বন্ধ তো তাই আর ঘাটায় নি। 


বছর দুই হলো রতনের বাবা মারা গেছেন, জমাজমি তেমন কিছু রেখে যাননি, উপরন্তু দেখা গেছে জমি গুলোর অধিকাংশই বিক্রি হয়ে গেছে । তাই কাজে বেরোতে হলো রতনকে, অবশ্য নিজেরই মামাতো ভাই ঠিকাদার হওয়ায় খুব একটা অসুবিধে হয়নি কাজ পেতে । লেখাপড়া ভালোই জানে বলে ওখানে হিসেবের কাজে রেখে দিয়েছিল রতন কে, তাই ভারী ভারী জিনিস তোলা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। এবার টাকাগুলো বেশি জমানো গেলো না,  তবে ভালো করে বাড়ি ফিরলে বাঁচি ;এরকমই সাত পাঁচ ভাবছিল রতন । বাড়িতে অসীমা, রতনের মা সবাই খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছে।একটু আগেই ফোনে কথা হলো বললো অনেকেই গ্রামে ফিরে এসে গেছে;  আজ  ফুচুরাও এসে গেছে; ওদের ক্লাব ঘরে থাকতে দিয়েছে; ফুচু রতনের বাল্যবন্ধু। চারদিন ধরে হাঁটছে রতনরা । পুলিশের তাড়া, লোকের বিশ্চক্ষু সবই পেতে হয়েছে ওদের । ভাগ্যিস পাওয়ার ব্যাংক টা কিনেছিল সেবার তাই ফোন টা চালু আছে এখনো । খবরে দেখলো বটে সরকার শ্রমিক স্পেশাল ট্রেন দেবে। কিনতু কি হয় কে জানে । রাস্তায় আসার সময় দোকান থেকে রুটি আর গুর কিনে নিয়েছিল ওরা । সেগুলোই খেয়েছে, খিদে মেটেনি যদিও তাও কি আর করা যাবে। ফোনটা একটু দেখে নিল রতন, ওয়ালপেপারে তিন্নির ছবি আছে,  তিনবছরের তিন্নির গাল গুলো বেশ ফোলা ফোলা ছিল, আর সামনের দাঁত টাও ভেঙে ছিল । একটা প্রশান্তি এলো শরীর জুড়ে। সন্তান যে কতটা দামী একজন পিতার কাছে সেটাই ভাবলো রতন ।এই হাসিটার জন্যই তো এত কষ্ট দুঃখ সইতে পারছে সে। দাড়ি গুলো বেশ বড়ো বড়ো হয়েছে, তিন্নি দেখে ঘাবড়ে যাবে না তো আবার; যদি ভয় পেয়ে যায় । তাপসের জন্য তাবিজ নিয়েছি বটে কিন্ত তিন্নির জন্য তো গণেশ বাদে কিছুই নিই নি ; সেটাও আবার তার দাবি মত নয়।
বাচ্চা মেয়েটার মন টা খুন্ন হবে, বাবা কে দেখে ছুটে আসবে যে, কিনতু আমি তো ১৪দিন ছুঁতে পাবনা ওকে। যাইহোক শরীর টা ক্লান্ত অনেক; আসে পাশের সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে । রতন একাই ভাবছে এত কথা । ব্যাগ টা পায়ের পাশে রেখে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো রতন । ধুর এরকম শক্ত পাথরে ঘুম হয় নাকি,  মনে হচ্ছে যেন চিতায় শুয়ে আছি । 

অদৃষ্ট হয়তো সেই কথা টা শুনতে পেয়েছিলন । লাইনের উপর শুয়েছিল সেদিন ওরা । ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল সরকারি নির্দেশে তাই সকলেই নিশ্চিন্তে ঘুম দিচ্ছিল। 
ধুরররররর এত আওয়াজ কিসের হচ্ছে, কে চিল্লাচ্ছে এত ভোর ভোর, চোখ খুলে তাকাতেও ইচ্ছে করলো না রতনের । শব্দটা এগিয়ে আসছে দানবের মতো কিন্তু হাত পা গুলো অবশ, চোখের পাতা টাও কথা শুনছে না ওর; কাপুনি টাও বাড়ছে শরীর জুড়ে ; বিকট শব্দ ট্রেনের হর্নের মতো। চোখ খুলে তাকালো রতন আর মাত্র সাত ফুট দূরে মৃত্যু দানব , পা টা নাড়াতে চেষ্টা করলো, পারলো না,  সব শিথিল হয়ে এসেছে, একটা অসহ্য যন্ত্রণা তারপর........................................
তিনমাস পর রতনের ব্যাগ টা বাড়িতে এসে পৌঁছল । 
পুলিশ এসে দিয়ে গেল, আর কিছু আর্থিক সহয়াতার কথা আগেই জানিয়েছে প্রশাসন। ব্যাগ খুলে তিন্নি বের করলো কিছু জামা কাপড়, কাগজ পত্র, তাবিজ আর লাল রঙের গণেশ টা.......................

Wednesday, April 1, 2020

ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট

April 01, 2020 0
ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট



সকালে উঠেই রতন বাবু চমকে উঠলেন।গলির মুখটা পেরোতেই দেখতে পেলেন জিনিসটা। নাহ জিনিসটা আর কিছুই নয় এটি অল্পবসনা এক যুবতীর দেহ। চিনতে একটু কষ্ট হল। মুখ নিচের দিকে করে পড়েছে। তাই স্তনটাও দেখা যাচ্ছেনা। খুব বেশি হলে বয়স হবে বছর পঁচিশেক। মাস খানেক আগেও মেয়েটা সকালে অফিস বেরোলে চায়ের দোকানে বসে বন্ধু বান্ধবদের সাথে বসে উত্থিত বুকের খাঁজটার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। বন্ধুদের নিজের মেয়ে জামাই ব্যাঙ্গালোরে কিভাবে জীবন যাপন করছে সেই জ্ঞান বিতরণ করার সাথে সাথেই আজকালকার মেয়েগুলো কিভাবে বখে যাচ্ছে সেই নিয়েও এক আধটা রিসার্চ পেপার দিয়ে দিতেন। রতনবাবু সবদিনই একটু বেশিই রসিক মানুষ কিন্তু এই মেয়েটি যেভাবে ওঁদেরকে পাত্তা না দিয়েই মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াত সেটা মোটেই সহ্য হতনা রতনবুর। আর মেয়েটাও লজ্জা শ্রমের মাথা খেয়ে সেই চায়ের দোকানটার সামনেই বুকের খাঁজ দেখিয়ে ঘুরে বেড়াত সেটা চোখের সুখ দিলেও কেন জানিনা ওঁদের বিশেষ সহ্য হতনা। এমনকি ওঁদের পাত্তা না দিয়ে যেভাবে সামনে দিয়ে সিগারেট কিনে নিয়ে যেত সেটা ওঁদের পৌরুষে বড়ই আঘাত দিত। কোথাও থেকে জানতে পেরেছিলেন মেয়েটির নাম পৃথা। পৃথা সামন্ত। বুড়ো বয়সে নাতির কাছে শিখেছিলেন কিভাবে ফেসবুকে কাউকে খুঁজতে হয়। নিজের মেয়ে জামাইকে রিকয়েস্টও পাঠিয়েছিলেন। আর সাথে পৃথার মুখবইএর দেওয়ালের ছবিগুলো শুধু রতন বাবু নয়, তাঁর অনেক বন্ধুদেরও পড়ন্ত বেলায় সেই সুখ দিত, যার দাবি লোকাল ট্রেনের কামরায় আকছার দেখা যায়। বাস্তবে ফিরলেন রতনবাবু। এখুনি খবর দিতে হবে পুলিশে। সাথে সাথে পাড়ার পরিচিত লোকদেরও ডাকলেন। নিজেদের প্রাচীরের ভেতর থেকেই হরেকমাল দশটাকার মতন একের পর এক বিশেষজ্ঞদের মতামত উঠে এল।
_____________

লকডাউনটা উঠেছে দিন দশেক হল। রতনবাবু পাড়ার মোড়ে হে হে কেমন দিলাম মার্কা হাসি হেসে বলতে লাগলেন "কি কথা লাগল তো? আমি আগেই বলেছিলাম মে মাসের পর সব ঠিক হয়ে যাবে।" লকডাউন উঠলেও জীবন এখনো অনেকাংশে শ্লথ। জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। বেচারা নান্টু এক প্যাকেট সিগারেটের দাম একশো চল্লিশ কেন করেছে সেই নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলছে। সরকার কিভাবে সুদের হার কমিয়ে চাকরিজীবী আর পেনশনারদের পকেট কাটছে সেটা নিয়ে এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন সুনীলবাবু। মাঝে দিলিপবাবু মিনমিন করে বেসরকারি কর্মীদের কথা তুলতেই রতনবাবু চুপ করিয়া দিলেন- "ওসব ছাড়ুনতো, ওরা তো বেতনও পেয়েছে, আবার চাকরিও যায়নি।" শুধু নান্টুই বোঝে এই চা সিগারেট বেচে আর যাই হোক তিনজনের সংসারেও ডালভাত আলুসেদ্ধর বেশি কিছু দেওয়া সম্ভব নয়। খবরে দেখাচ্ছে একের পর এক কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কেউ বা দুমাসের বেতন দিতে গিয়ে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। মহামারী জীবন নিয়েছে হাজার কুড়ি মানুষের, আর অনাহারে মরেছে লাখখানেক। তাতে অবশ্য রতনবাবুর কিছুই আসে যায়না। কারন তাঁর পেনশন ঠিক ঢুকেছে। চায়ের দোকানে রাজ্যজয় করে যখন ব্যাগে প্রমান সাইজের কাতলা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন রতনবাবু, মাথায় একটা প্রশ্ন এল। অনেকদিন সামনে থেকে মেয়েটাকে দেখেননি। এমনকি ছাদে মেয়েটার অন্তর্বাসও শোকাতে দেখেননি বেশ কিছুদিন হল।নতুন পোস্টও আসেনি, পুরোনো ছবিগুলো দেখে দেখে রতনবাবুর চোখ পচে গেছে। অথচ গত পরশুও ওই রুমে আলো জ্বলতে দেখেছেন রাত্তিরে। কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারছেন না। ভাবলেন একবার ঘরে ঢুকে ফ্রেন্ডলিস্ট হাইড করার অপশনটা নাতির কাছে শিখে নেবেন। তিনি দেখেছেন, বৌমার কোনো বন্ধুকে তিনি দেখতে পাননা, কেবল তাঁর বন্ধুদের ছাড়া।তারপর একটা ফ্রেন্ডড রিকুয়েস্ট পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করবেন কি হল ওর। সেরম হলে কিছু উষ্ণ কথাবার্তাও চালাচালি হতে পারে। একদিন ইন্দুবাবু আড়ালে বলেছিলেন উনার নাকি ওরম কিছু ফ্রেন্ড আছে।

-----------------

ঘড়ির কাঁটায় পাক্কা বারোটা। গলাটা শুকিয়ে এল পৃথার। জলের বোতলটা হাতড়ে খুঁজতে চেষ্টা করল। কিন্তু পেলনা। জানালার বাইরে চাঁদ উঠেছে। অন্ধকারের চাঁদের আলোয় আকাশটা একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে। চারিদিকের প্রকৃতি নিস্তব্ধ। দেখে বোঝার উপায় নেই দিনের বেলায় কি চলছে চারিদিকে। একদম শুভ্র চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। অনেক কষ্টে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে পেল জলের বোতলটা। তার ইচ্ছে হল অনেকদিন বাদে এই রাতে চাঁদের আলোয় একবার ছাদে গিয়ে বসতে। টলতে টলতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এল পৃথা। আজ একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেছে। শরীরের প্রতিটা নার্ভ অবশ হয়ে আসছে তার। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পুরো ছাদটা। চারিদিকে আলোর বন্যা হয়ে গেছে। এই আলো শান্ত শুভ্র। পৃথা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলনা। টলতে টলতে বসে পড়ল। বুক ভরে নিশ্বাস নিয়ে নিল। সিগারেটটা ধরিয়ে একবার জোরে টেনে নিল। হঠাৎ করেই পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ে যেতে লাগল তার। বেশ ভালোই চলছিল সব। সকাল সাড়ে নটায় ঘুম থেকে ওঠা, যেমন তেমন করে স্নান, একবাটি ম্যাগি গিলে অফিস দৌড়ানো। অফিসে গিয়ে সারাদিনের খাটনি, বসের চেল্লামিল্লি, স্ট্রেস কমানোর জন্য সিগারেট, দিনের শেষে দু পাত্তর এলকোহল পান করে ঘুম। কিন্তু হঠাৎ করেই ছন্দপতন। মহামারী এলো দেশে। তারপর সব বন্ধ। অফিস বন্ধ। পনের হাজারের চাকরিটাও গেল।তবে বস বলেছেন কোম্পানি থাকলে যেমন করে হোক কিছু কাজ দেবেন। বাড়ি যাওয়ার উপায় নেই। আর কয়েকদিন পর কোম্পানীটাই বন্ধ হয়ে গেল।খাবার দাওয়ার যা ছিল তাতে হপ্তা খানেক চলেছে। মাসের বেতনটা পেয়ে পৃথা বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। অন্তত ভাইটা যাতে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকে। বাড়ির মালিক ইউরোপ থেকে ফিরতে পারেনি, তাই এখন বাড়ি ভাড়া দেয়ার চাপ নেই। একদিন পাড়ার দোকানের ছেলেটাকে দিয়ে কয়েক প্যাকেট ম্যাগি আনিয়েছিল পৃথা। ওই ম্যাগি আর পার্টি করার জন্য পরে থাকা মদ সিগারেট নিয়েই দু মাস কোনো রকমে চালিয়েছে। না ফোনে রিচার্জ ছিল, না জামা কাপড় কাঁচার ডিটারজেন্ট। আজ সব কিছু দূরে সরে গেছে। নাহ পৃথার সেই রূপ আর নেই আজ। যা দিয়ে দেখে প্রত্যেকে ঢলে যেত তার দিকে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। স্তন ঝুলে গেছে। গোটা শরীর জুড়ে লোমের আধিক্য। শরীরে অপুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। নাহ পৃথার সহ্য হলনা আর। এই পৃথাকে গোটা ভার্চুয়াল দুনিয়া তো দূর, পৃথা নিজেই চেনেনা। পাশের বাড়ির ওয়াইফাই দিয়ে পৃথা ফোনটা চালাল। নোটিফিকেশন এসেছে। Ratan Chaudhury Sent you friend request। পৃথা নিজের মনেই হাসল। বুড়ো না দেখতে পেয়ে শেষে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টই পাঠিয়ে দিল। নাহ আর ভাবলনা পৃথা। একবার জোরে স্বাস নিল। নিজের বুকের দিকে তাকাল।ক্লিভেজটা আরেকটু পরিষ্কার করল। রিকুয়েস্টটা স্বীকার করেই উঠে দাঁড়াল। তারপর ধপ করে একটা শব্দ।
রতন বাবু দেখলেন সব কাজ শেষ। নাহ একটা বাকি আছে, এখুনি বাড়িতে গিয়ে রিকোয়েস্টটা ক্যান্সেল করতে হবে।নইলে ইজ্জতের সব শেষ হয়ে যাবে।
©Avi Nandan

Thursday, March 26, 2020

শেষের পর

March 26, 2020 0
শেষের পর
কাল সকালে হয়ত নিশ্বাসটা আরেকটু হালকা হবে, পৃথিবীটা একটু হালকা হবে। কিছু মানুষ হেরে গিয়ে হারিয়ে যাবে। খুব হালকা লাগছে নিজের। ঘন্টা খানেক আগেই শেষ বার প্রানভরে প্রশ্বাস নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলাম শুধু। তারপর চারিদিকের অন্ধকারটা কেটে গিয়ে কেবলই আলো।আমার নিথর দেহটা পড়ে আছে হাসপাতালের ঘরে। আরো তিনচার খানার সাথেই। গত পরশু শেষবার ডাক্তার দেখে গিয়েছিল। তারপর শুনেছি সেও আমাদেরই পথের যাত্রী। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল আমার পাশের বেড থেকে দুদিন ধরেই গন্ধ বেরোচ্ছে, কিন্তু কেউ হাত দেওয়ার নেই। গত দুদিন যে মাছি গুলো ওই বেডটায় ভনভন করত তারা আজ আমার নাকের ওপর ঘুরছে। নাহ একটুও অসুবিধা হচ্ছেনা। এই হাসপাতালের এই দুটো রুমই শেষ অবধি ব্যবহারের যোগ্য ছিল। সাফাইওয়ালা নাকি মরে পরে আছে মর্গের বাইরে। বাকি রুমগুলোয় বেডের সাথে জামা কাপড় আর মৃতদেহ মিশে সে এক যাচ্ছেতাই অবস্থা। এখন শুধুই মনে হচ্ছে মরে তো গেলাম অথচ এত ভারী দেহটা কেউ সৎকার করবেনা। আমার জানালাটা দিয়ে গতকাল দেখেছি দুটো কুকুর একটা বডির হাত পা নিয়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। গত সপ্তাহে গ্রামের শেষ মানুষটাও মারা গেছে বলে শুনেছিলাম।আর এই হাসপাতালের চারটে আধমরা লোক আর ডাক্তার টুকুই বেঁচে ছিল। তার মধ্যেও আমি একজন। হাসপাতালের পুরোনো বাল্ব, নোংরা সবুজ পর্দা, মড়া পচা দুর্গন্ধ আর কয়েকটা বাঁচা মরা বডি। ব্যাস এইটুকুই ছিল জীবন শেষ কটা হপ্তা। যখন নিজে টেনে হিঁচড়ে নিজেকে হাসপাতালে আনি ব্যাংকের বইটা খুলে দেখলাম রয়ে গিয়েছিল কিছু টাকা, যা আঁকড়ে রেখেছিলাম যখের ধনের মতন শেষ দিকে কিছু খাবো বলে। না কাজে আসেনি। কাজে এসেছিল পোষা বেড়ালটা, কুচি কুচি করে খেয়েছিলাম। স্বার্থ পরের মতো একা। নাহ এটা শুরু নয়, শুরুটা আগেই হয়েছিল যখন একে একে সব্বাই অসুস্থ হল আর আমি ঘরে বন্দি হয়ে ওদের সংশ্রব এড়ালাম। ওদের শেষবার দেখিনি অবধি যদি আমিও ইনফেক্টেড হয়ে যাই। মনে আছে কতবার চিৎকার করে করে জল চেয়েছিল সব্বাই, নাহ দেইনি। দরজাটা শক্ত করে আটকে রেখেছিলাম। আর আজ আমার ডেডবডিটা খুবলে খাচ্ছে কুকুরগুলো। শেষ কটাদিন শুধু ভয় পেয়েছি কুকুর গুলোকে, ওরা বসে থাকতে দরজার ঐপারে সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে।এই ভয়েই থাকতাম শুধু ওরা যদি কামড়ে খেয়ে নেয় আমাকে জ্যান্ত। আজ পাশের বেডের বিমলদাও বোধহয় মারা যাবে, যাক একসাথেই যাবো। ততক্ষণ একটু পোষা বেড়ালটার আঁচড় খেয়ে নেই, যাকে কেটে খেয়েছিলাম শেষদিন। বাকিদের সাথে নাহয় পরেই দেখা হবে।

©Avi Nandan